সম্পাদকীয় মতামত:
বাল্যবিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, যা একটি কিশোরীর শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ সমস্যা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেয়েদের নিরাপত্তা, শিক্ষার সুযোগ এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হতে পারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কার্যকর পথ।
কোনো কিশোরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে কিছু অভিভাবক অল্প বয়সে বিয়েকে সমাধান হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথে হয়রানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ কিংবা মেয়েদের চলাফেরা নিয়ে সামাজিক চাপ তাঁদের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। কিন্তু বিয়ে কোনো কিশোরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় নয়। বরং অল্প বয়সে বিয়ে তার শিক্ষাজীবন ব্যাহত করতে পারে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সীমিত করে দিতে পারে।
মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথ নিরাপদ করা, হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে সহযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্মার্টফোনের ব্যবহার হোক দায়িত্বশীল
বর্তমান সময়ে শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বিশ্ব সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, বইপত্র এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে শিক্ষার্থীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। তাই স্মার্টফোনকে এককভাবে বাল্যবিবাহের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ নয়।
তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে অসচেতন থাকলেও কিশোর-কিশোরীরা সমস্যায় পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা।
স্মার্টফোনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং বয়সোপযোগী ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রয়োজন। প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা জরুরি। এ কারণে স্মার্টফোন ব্যবহারের উদ্বেগকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
দারিদ্র্য ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি
বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো কোনো পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক চাপের কারণে অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার ‘মেয়ে বড় হয়ে গেছে’, ‘ভালো বিয়ের প্রস্তাব এসেছে’ কিংবা ‘সমাজ কী বলবে’—এ ধরনের প্রচলিত ধারণাও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এসব পরিস্থিতিতে পরিবারকে শুধু দোষারোপ না করে সমস্যার কারণগুলো বোঝা প্রয়োজন। মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ সৃষ্টি, আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উদ্যোগ আরও কার্যকর করা সম্ভব।
পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সহযোগিতায় নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে তরুণ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভব বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি চিহ্নিত করা, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবারকে পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচলিত আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। মেয়েদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে গড়ে তুলতে হবে।
একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ গঠনে তার শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। স্মার্টফোনের দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ, পারিবারিক সচেতনতা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার সমন্বিত উদ্যোগই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি মেয়ের হাতে বিয়ের কার্ড নয়, বই তুলে দেওয়াই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।
লেখক: এম. মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার
সম্পাদক, রাঙ্গুনিয়া টুডে