রাঙ্গুনিয়া টুডে ডেস্ক : আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পূজামণ্ডপে ২৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবক রাখা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, মাদক প্রতিরোধ, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বন্ধ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (রাঙ্গুনিয়া-রাউজান সার্কেল) মো. বেলায়েত হোসেন।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার আয়োজনে উপজেলার একটি কমিউনিটি সেন্টারে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহির উদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন এএসপি মো. বেলায়েত হোসেন।
সভায় এএসপি বেলায়েত হোসেন বলেন, “আমরা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপন করব। এখানে আমাদের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য থাকতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান থাকতে হবে।”
মাদক প্রতিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন, “মাদকের বিষয়ে আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে পূজামণ্ডপের ভেতরে যেন মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সে দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে। আপনারা এমন কিছু করবেন না, যাতে মা দুর্গার অসম্মান হয়। এতটুকুই আমাদের অনুরোধ থাকবে।”
সিসিটিভি ও ২৪ ঘণ্টা পাহারার ওপর গুরুত্ব
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে এএসপি বেলায়েত বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব মণ্ডপ এখনো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আসেনি, সেগুলো দ্রুত ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
পূজামণ্ডপে ভোররাতে লোকজনের উপস্থিতি কম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পূজামণ্ডপে পুলিশ থাকুক, আনসার থাকুক অথবা না থাকুক, কখনোই কোনো প্রতিমা একা রাখা যাবে না। অবশ্যই আপনাদের স্বেচ্ছাসেবক যেন ২৪ ঘণ্টা সেখানে থাকে। কোনো অবস্থাতেই প্রতিমা অরক্ষিত রাখা যাবে না।”
পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে বলেন তিনি। তবে এ নিয়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো যাবে না বলেও সতর্ক করেন।
এএসপি বেলায়েত হোসেন আরও বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তা দিনের মধ্যে অন্তত একবার পরিদর্শনে যাবেন। কোনো অভিযোগ বা সমস্যা থাকলে পুলিশকে জানাতে হবে। নিজেরা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়ানো যাবে না।
বহিরাগতদের বিষয়ে সতর্কতা ও নারীদের নিরাপত্তা
পূজামণ্ডপে তরুণদের উপস্থিতি এবং বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে এএসপি বেলায়েত বলেন, দুর্গাপূজা বছরে একবার হওয়ায় তরুণদের মধ্যে উৎসব নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ থাকে। এ সময় স্বেচ্ছাসেবকদের খেয়াল রাখতে হবে, কারা এলাকার বাসিন্দা এবং কারা বাইরে থেকে আসছেন। এ বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি বলেন, বড় পূজামণ্ডপগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে মা-বোনদের নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ ইভটিজিং কিংবা হয়রানিমূলক কথাবার্তার শিকার না হন। পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও এ বিষয়ে পূজামণ্ডপের আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও সচেতন থাকতে হবে।
নারীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, “পূজামণ্ডপ থেকে কেউ যখন বাসায় যাবেন, আপনারা কেউ যেন একা একা বাসায় না যান, বিশেষ করে মহিলারা। চার-পাঁচজন করে যাতে দলবদ্ধভাবে যান।”
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপ বা ওয়ার্ড পর্যায়ে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব নয়। তবে পুলিশের টহল দল থাকবে। তাই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। নারীরা যেন দলবদ্ধভাবে চলাচল করেন এবং যাতায়াতের পথে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
গুজব ছড়ালে দায় এড়ানো যাবে না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করে এএসপি বেলায়েত হোসেন বলেন, “আমরা বর্তমান সময়ে যে বিষয়টি বেশি ফেস করছি, সেটি হলো গুজব। দেখা গেল, দেশের বাইরের কোনো ঘটনা অথবা দেশেরই দুই থেকে চার বছর আগের কোনো ঘটনা হঠাৎ করে রাঙ্গুনিয়ার নাম দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হলো।”
তিনি বলেন, ধর্মীয় বিষয়ে মানুষ অনেক সময় বিবেক দিয়ে কাজ না করে আবেগ দিয়ে কাজ করে। ঘটনা সত্য কি না, তা যাচাই না করেই অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। এতে মূল পোস্টের পাশাপাশি শেয়ার করার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের কাছে গুজব পৌঁছে যায়। ফলে গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে শেয়ারদাতাও দায়ী হয়ে পড়েন।
এএসপি বেলায়েত বলেন, “এ ধরনের কিছু দেখলেই দয়া করে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার দেবেন না, প্রতিক্রিয়া জানাবেন না। আপনাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আপনারা যদি এমন কিছু দেখেন, দয়া করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, যাতে গুজব সমর্থন না পায়।”
সূর্যাস্তের আগে প্রতিমা বিসর্জনের অনুরোধ
প্রতিমা বিসর্জনের সময় পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে এএসপি বেলায়েত হোসেন বলেন, পূজা যত শেষের দিকে যায়, ততই অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে প্রতিমা বিসর্জনের সময় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা কাম্য নয়।
তিনি বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের সময় নির্ধারণ করে দেয় থানা বা স্থানীয় প্রশাসন নয়। কেন্দ্রীয় পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের ওপর বর্তায়।
এএসপি বেলায়েত বলেন, “আমি অনুরোধ করব, আপনারা সূর্যাস্তের আগেই যেন প্রতিমা বিসর্জন দেন। এই পূজার প্রতিমা বিসর্জনের সময় যেন আপনাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকে, সেই প্রত্যাশা করছি।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিবছরের মতো এবারও রাঙ্গুনিয়ায় অত্যন্ত সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হবে।
দুর্গাপূজায় বাধা ও গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
দুর্গাপূজা উদ্যাপনে বাধা সৃষ্টি, গুজব ছড়ানো কিংবা উৎসবকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন এএসপি বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, “এই দুর্গাপূজা উদ্যাপনে যে বা যারা বাধা সৃষ্টি করবে, গুজব রটাবে কিংবা এটাকে ইস্যু করে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে, মনে রাখবেন, সে আপনার ধর্মের শত্রু, সে আমার ধর্মের শত্রু, সে রাষ্ট্রের শত্রু। এ বিষয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।”
সভায় আরও বক্তব্য দেন থানা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে, এ বছর রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ১৯৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।