
রাঙ্গুনিয়ায় দুই শিশুর হারিয়ে যাওয়া ও মানবিক উদ্ধার অভিযান
রাঙ্গুনিয়া টুডে প্রতিবেদক: একটা অন্ধকার রাত। দুই অবুঝ শিশু পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়ায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে।
কে জানে তারা কোথা থেকে এসেছে? কোথায় যাবে?
তারা হারিয়ে গেছে—কখনো হয়তো ফিরে আসবে, আবার কখনো হারিয়ে যাবে এমন এক পরিণতির দিকে, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে—দুই শিশুকে পাওয়া গেছে। কেউ চিনে থাকলে যেন যোগাযোগ করা হয়।
জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের রাজারহাট এলাকায় রাত সাড়ে ৮টার দিকে শিশু দুজনকে পাওয়া যায়।
এক রিকশাচালক শিশুদের নিয়ে যান পার্শ্ববর্তী পারুয়া ইউনিয়নে। শিশুদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায়, স্থানীয় এক যুবক, মুসাফির তালুকদার, গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন। পরে তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিও ও ছবি পোস্ট করেন যাতে তাদের পরিবার খুঁজে পাওয়া যায়।
জোনাকি ও আয়েশা—দুই অবুঝ মুখের পরিচয়
শিশু দুটির একজনের নাম জোনাকি, অপরজন আয়েশা। তারা জানায়—তাদের বাবার নাম সোহেল, মায়ের নাম মুন্নী। কখনো তারা বলে সৈয়দনগর, কখনো কাটাখালি—ঠিকানা তারা মনে রাখতে পারে না।
পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার কিছুক্ষণ পরই পশ্চিম নিশ্চিন্তাপুর এলাকা থেকে ফোন আসে। এক ব্যক্তি তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং জানান, শিশুদের নানী পরদিন সকালেই প্রমাণপত্রসহ এসে নিয়ে যাবেন।
পরদিনই এক করুণ বাস্তবতা উন্মোচিত হয়

বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে জোনাকি(৯) ও আয়েশার(৭) নানী এসে তাদের পারুয়া থেকে নিয়ে যান।
“কিন্তু পরদিন আরও একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা সামনে আসে।”
জানা যায়, জোনাকি ও আয়েশার বাবা-মার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে। তারা এখন নানীর কাছে থাকে।
পায় না বাবার আদর, কিংবা মায়ের যত্ন। কারণ মা মুন্নী শহরে কাজ করেন জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে।
বাবা-মা উভয়ের মধ্যেই রয়েছে কিছুটা মানসিক সমস্যা, আর শিশু দুজনের একজন মানসিকভাবে কিছুটা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (বিকারগ্রস্ত)। এ অবস্থায় তারা প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, ঠিকানা মনে রাখতে পারে না। মুঠোফোনে এসব তথ্য জানিয়ে শিশুদের নানী মো. ননা মিয়ার স্ত্রী রানু আক্তার জানান, তারা এর আগেও বেশ কয়েকবার হারিয়ে গিয়েছিল শেষবার কাউখালি থানার সহায়তায় পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে তারা তার কাছেই থাকেন উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের পশ্চিম নিশ্চিন্তাপুর এলাকার সোনারগাঁও এলাকা সংলগ্ন ঘোনাকূল ওরনার টিলা এলাকায়।
“দারিদ্রতার কাছে তিনিও পরাজিত, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই দুই নাতনির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করেও তবুও হারিয়ে যায় তারা।”
প্রশ্ন: এবার তারা ফিরে এসেছে ভালো কিছু মানুষের সহানুভূতিতে, কিন্তু আগামীবার?
“পূর্বের আরেক করুণ গল্প: মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন
এ ধরনের একটি ঘটনা আগেও ঘটেছে রাঙ্গুনিয়ার হোসনাবাদ ইউনিয়নের ওসমানের টেক এলাকার আমড়াকাটার বাড়িতে।
সেখানে এক মেধাবী ছেলে, সাজ্জাদ হোসেন, ছোটবেলা থেকেই মেধাবী হলেও ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
তার পরিবারের কারো মানসিক সমস্যা না থাকলেও, সাজ্জাদের সমস্যা সময়ের সঙ্গে বাড়ে। সে প্রায়ই হারিয়ে যেতো। কখনো ফিরে আসতো, কখনো বহুদিন নিখোঁজ থাকতো।
শেষবার সে হারিয়ে যায় চিরতরে। তার বাবা অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু ছেলের মুখ শেষবার আর দেখতে পারেননি।
সাজ্জাদের গল্প আমাদের শেখায়—মানসিক অসুস্থতা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের কষ্ট এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।”
নিরাপদ নয় এই অনিশ্চিত পথচলা
জোনাকি ও আয়েশার গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি বাংলাদেশের অনেক শিশুর বাস্তবতা।
তারা হারিয়ে যায়— কখনো ফিরে আসে কারো মমতায়,
আবার কখনো হারিয়ে যায় নির্মম পরিণতির অন্ধকারে।
এখনই যা করণীয়:
১. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা:
শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রশাসনিক নজরদারি:
স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়মিত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
৩. পরিচয়পত্র ব্যবস্থা:
শিশুদের জন্য আইডেন্টিটি ট্যাগ, নামপোতা জামাকাপড় কিংবা ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম চালু করা যেতে পারে।
৪. কমিউনিটি সাপোর্ট:
স্থানীয় দোকান, বাজার, মসজিদ-মন্দিরের লোকদের সচেতন করা জরুরি—যাতে তারা হারিয়ে যাওয়া শিশুকে দ্রুত সঠিক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে পারেন।
শেষ কথা: আজ জোনাকি ও আয়েশা ফিরে এসেছে।
কিন্তু এটাই কি শেষবার? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।
“আমরা জানি না, এটাই কি তাদের হারানোর শেষবার?
কিন্তু এটুকু জানি—তারা যেন আর না হারায়,
তাদের ছোট্ট জীবন যেন থেমে না যায় কোনো নির্মম পরিণতির কাছে। এই দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।”
প্রতিবেদন: এম মোয়াজ্জেম হোসেন কায়সার,
সম্পাদক: রাঙ্গুনিয়া টুডে।