গণশুনানীতে মিলছে তাৎক্ষণিক সহায়তা, চট্টগ্রামে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ

চট্টগ্রাম: বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত গণশুনানি কার্যক্রম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় পরিণত হচ্ছে। অসহায়, দরিদ্র ও বিপর্যস্ত মানুষ তাদের নানা সমস্যার সমাধানের আশায় ভিড় করছেন এই আয়োজনে—যেখানে অভিযোগ শুধু শোনা নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক গণশুনানীতে মানবিক একাধিক দৃশ্য উপস্থিতদের নাড়া দেয়। মাত্র ১৫ দিনের শিশুকে কোলে নিয়ে হাজির হন স্বামী পরিত্যক্তা সুরাইয়া বেগম। সন্তানের চিকিৎসা ও লালন-পালনের জন্য সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা তাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

একই গণশুনানীতে আকবরশাহ এলাকার তাসলিমা আক্তার, যিনি কিডনি ও ক্যান্সারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত, তিনিও সহায়তা পান। অসুস্থতার কারণে কর্মক্ষমতা হারানো এই নারী দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। তার আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

বন্দর এলাকার লাইজু বেগম তার সন্তানের চোখের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইলে তাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। একইভাবে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর নাজমা বেগম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন, গণশুনানীতে আবেদন জানিয়ে সহায়তা পান।

মিরসরাই উপজেলার রেমন্ডু ফিলিপ রায় গুরুতর অসুস্থতায় একটি পা হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় থাকা এই ব্যক্তিকে সহায়তার পাশাপাশি তার সন্তানের পড়াশোনার বিষয়েও খোঁজ নেন জেলা প্রশাসক।

এছাড়াও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও আর্থিক সংকটে থাকা আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি—বিধবা মাছুমা, হৃদরোগে আক্রান্ত মাবিয়া খাতুন, স্বামীহারা নাহার, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য আবেদনকারী আর্জিনা আক্তার এবং এক কলেজ শিক্ষার্থী—এই গণশুনানীতে সহায়তা পেয়েছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বুধবার আয়োজিত এই গণশুনানীতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত সেবাপ্রত্যাশীদের আবেদন ও অভিযোগ শোনা হয়। সর্বশেষ আয়োজনে ৭৪ জনের সমস্যা শোনা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিন ৯ জন অসুস্থ ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ৪৮ জন দুস্থ মানুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

গণশুনানীতে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা জানান, জেলা প্রশাসক ধৈর্যসহকারে তাদের কথা শোনেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, যা তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গণশুনানি এখন শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়—এটি ধীরে ধীরে মানুষের নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে একটি মানবিক উদ্যোগ বদলে দিচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন।

কাঁচা সড়কে ভরসা, বর্ষায় বন্ধ স্কুলে যাওয়া—রাঙ্গুনিয়ার হালিমপুরে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : দুর্গম এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে আশোবা ওয়াজেদ প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে যাতায়াতের একমাত্র কাঁচা সড়কের দুরবস্থার কারণে বর্ষা এলেই কার্যত থমকে যায় পাঠদান কার্যক্রম। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে শত শত শিক্ষার্থী।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ১ নম্বর রাজানগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হালিমপুর এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টি ২০১৯ সালে এলাকার কৃতি সন্তান অধ্যাপক ডা. ওয়াকিল আহমদ তাঁর মরহুম পিতা-মাতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বর্তমানে বিদ্যালয়টি প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে নিয়মিত পড়াশোনা করছে। হালিমপুরসহ বাইশ্যের ডেবা, গাজী বাড়ি, বাইশ্যের বাড়ি, মোহাম্মদপুর, দরবানীর বাড়ি ও ফুল বাগিচা গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এক থেকে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে আসে।

কিন্তু বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র কাঁচা সড়কটি এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কোনোভাবে চলাচল করা গেলেও বর্ষা এলেই সড়কটি কাদামাটিতে পরিণত হয়ে পড়ে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও পিচ্ছিল ও জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সড়কটি তখন প্রায় অচল হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে এবং নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, “শুকনো মৌসুমে আমরা নিয়মিত স্কুলে আসতে পারি। কিন্তু বর্ষা শুরু হলেই রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে, কাপড় নষ্ট হয়ে যায়—তাই অনেক সময় স্কুলে আসা সম্ভব হয় না।”

অভিভাবকদের অভিযোগও একই। স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা করুক—এটাই চাই। কিন্তু বর্ষাকালে রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে তাদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। অনেক সময় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একরাম হোসেন বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বর্ষা এলেই তা অর্ধেকে নেমে আসে। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত আসতে পারে না, ফলে তাদের পড়াশোনায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। সড়কটির উন্নয়ন হলে শিক্ষার পরিবেশ অনেক ভালো হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা বখতেয়ার উদ্দিন বলেন, “এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু সড়কের এমন বেহাল অবস্থার কারণে সেই সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।”

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরীর কাছে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে এমপির প্রতিনিধি ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইউসুফ চৌধুরী জানান, “বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।”

এলাকাবাসীর দাবি, শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে সড়কটি সংস্কার করে বর্ষা মৌসুমেও চলাচল উপযোগী করা হোক।

রাঙ্গুনিয়ায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : রাঙ্গুনিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে আবারও ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উপজেলা জুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা ও আগ্রহ।

এই কর্মসূচিকে বাস্তব রূপ দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।

বুধবার (২২ এপ্রিল) তিনি রাঙ্গুনিয়া আদর্শ বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, চন্দ্রঘোনা আদর্শ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, মজুমদারখীল উচ্চ বিদ্যালয় এবং খিলমোগল রসিক উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে ছিলেন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার সুমন শর্মা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তারা খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বক্তব্যে তারা বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্ধারিত এই কর্মসূচিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্টসহ মোট ৮টি ইভেন্ট রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও ক্রীড়া পরিদপ্তরের যৌথ ব্যবস্থাপনায় ধাপে ধাপে বাছাইয়ের মাধ্যমে সেরা প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে।

স্কুলভিত্তিক এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই ইতোমধ্যে বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। শিক্ষক ও অভিভাবকরাও উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ এখন আর শুধু একটি কর্মসূচি নয়—রাঙ্গুনিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠছে।