
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী হেফাজত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।
প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসায় পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। পরে মাদ্রাসার ভেতরে বাবুনগরীর খাস কামরায় দুজনের মধ্যে রুদ্ধদ্বার একান্ত বৈঠক হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ফটিকছড়ি আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানও সেখানে ছিলেন।
বৈঠকের বিস্তারিত জানা না গেলেও অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, সাক্ষাতে মূলত হেফাজত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।
হেফাজতের ১৩ দফা দাবি
বৈঠক শেষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
দাবিগুলোর মধ্যে ইসলাম অবমাননা রোধে আইন, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন না করা এবং কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি রয়েছে।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানানো হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশনারি তৎপরতা বন্ধ, আলেমদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার দাবিও ওঠে সভায়।
মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়।
পাশাপাশি ২০১৩, ২০২১ ও ২০২৪ সালের সহিংসতার বিচার এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেমদের সুযোগ দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করেন হেফাজতের নেতারা।
‘কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন হবে না’
মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন হবে না।’
তিনি জানান, শাপলা চত্বর মামলার চার্জশিট হয়েছে এবং শিগগিরই এর বিচারকাজ শুরু হবে। আলেমদের বিরুদ্ধে মামলার তালিকা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি অনুযায়ী নিয়োগের বিষয়ে সরকার কাজ করবে বলেও আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মদিনা ও সাহাবাদের চর্চিত ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করেই বাংলাদেশ পরিচালিত হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘সমস্যা ও দাবিদাওয়া পর্যায়ক্রমে সমাধান হবে’
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশের সমস্যা ও মানুষের দাবিদাওয়া পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।
তিনি বলেন, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সক্ষম হলেও পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অতীতে দেশের অর্থ-সম্পদ লুট ও পাচারের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
হাজারো মানুষের স্বাগত
এর আগে বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা থেকে ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘীর মাঠে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সড়কপথে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক হয়ে তিনি আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পেলাগাজীর দিঘী থেকে বাবুনগর মাদ্রাসা পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে স্বাগত জানায়।
মাদ্রাসার কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে শিশু শিক্ষার্থীসহ উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের পর সরকার ও হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের এই মতবিনিময়কে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
