ছাদ বাগানে আদা চাষ, বড় ফলবাগানের স্বপ্ন দেখছেন বিএনপি নেতা

রাঙ্গুনিয়া টুডে প্রতিবেদক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভেসে ওঠা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, বাড়ির ছাদে সারি সারি বস্তায় আদা চাষ। পাশে দাঁড়িয়ে কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন এক সৌখিন বাগানি। প্রথম দেখায় সাধারণ কোনো কৃষক মনে হলেও, খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি স্থানীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ, কাউখালির বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী।
রাজনীতির ব্যস্ততার মাঝেও কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন ছাদ ও আঙিনাজুড়ে ফল ও মসলাজাতীয় ফসলের ছোট্ট এক সবুজ জগৎ। তার এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি, বাবার অনুপ্রেরণা এবং কৃষির প্রতি গভীর টান।

রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালি উপজেলার বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছপালার প্রতি তার আলাদা ভালোবাসা ছিল। তার বাবা হাজী অলি আহমদ সওদাগর ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতেন। বাবার দেখাদেখিই গাছ লাগানো ও কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই কৃষিকে ভালোবাসতাম। ইচ্ছে ছিল কৃষি ডিপ্লোমা নিয়ে পড়াশোনা করবো। কিন্তু বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। তখন আর স্বপ্ন পূরণ হয়নি।”
১৯৯২ সালে রাউজান কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ছোট পরিসরে ফার্নিচারের ব্যবসা শুরু করেন। একই সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। পরে যুবদল হয়ে বর্তমানে বেতবুনিয়া মডেল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

রাজনীতির পাশাপাশি কৃষিকে আঁকড়ে ধরা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষিভিত্তিক চিন্তাধারাও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”
বর্তমানে তার ২ হাজার ১০০ স্কয়ার ফিটের ছাদজুড়ে রয়েছে ২০০ বস্তা আদা চাষ। পাশাপাশি রয়েছে ২০ থেকে ৩০টি ড্রাগন ফলের গাছ, বিভিন্ন জাতের আম, কমলা ও অন্যান্য ফলজ গাছ। বাড়ির আঙিনাতেও গড়ে তুলেছেন লটকন, মাল্টা, জামরুল, আমড়া, কলাসহ নানা ফলের বাগান।

তবে এই পথটা খুব সহজ ছিল না। আদা চাষে একসময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “১৯৯০ সালের দিকে আদা চাষে আগ্রহ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু নানা রোগবালাই ও কম দামের কারণে বড় ধরনের লোকসান হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বস্তায় আদা চাষের বিষয়টি দেখে নতুনভাবে শুরু করি।”
তার ভাষ্য, বস্তায় আদা চাষে রোগবালাই কম হয় এবং পচনের ঝুঁকিও কম থাকে। দুই বছর আগে ১০০ বস্তা দিয়ে শুরু করেন তিনি। প্রথম বছরে প্রতি বস্তায় প্রায় ৫০ টাকা খরচে এক কেজির মতো আদা উৎপাদন হয় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এবার চাষের পরিমাণ বাড়িয়ে ২০০ বস্তায় নিয়েছেন।
ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে ফলের বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ লক্ষ্যে ৪০ পরিবারকে নিয়ে একটি বাগানভিত্তিক উদ্যোগ গড়ার চিন্তা করছেন। এ বিষয়ে কৃষি অফিসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
কাউখালি উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সহিদুজ্জামান বলেন, “মোহাম্মদ আলী মূলত শখের বশেই ছাদ ও বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ফল ও মসলাজাতীয় ফসল চাষ করছেন। কৃষি অফিস থেকে তাকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হয়। রোগবালাই দমন, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার বিষয়েও সহযোগিতা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “তার ছাদ বাগানের আদা চাষ থেকে ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভ হতে পারে বলে আশা করছি।”
৫৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলীর পরিবারেও রয়েছে কৃষির প্রতি আগ্রহ। দুই সন্তানের জনক তিনি। তার ছেলে বর্তমানে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
রাজনীতি, ব্যবসা আর কৃষি, তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে সামলালেও মোহাম্মদ আলীর বিশ্বাস, কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে মানুষ মাটির কাছাকাছি থাকে। আর সেই টান থেকেই তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন আরও বড় এক সবুজ বাগানের।
