মায়ের অপেক্ষা শেষ হলো কফিনবন্দী চার ছেলের ফিরে আসায়, শেষ বিদায়ে হাজারো মানুষের ঢল

রাঙ্গুনিয়া টুডে প্রতিবেদক : মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকার চার সহোদর ভাইকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের ঢল নেমেছে। বুধবার (২০ মে) সকাল ১১টায় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১১টার দিকে দুটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণকালে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গুনিয়া সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। পরে বুধবার ভোরে নিজ গ্রাম বান্দারাজার পাড়ায় পৌঁছায় চার সহোদরের মরদেহ।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকাল থেকে দলে দলে নারী-পুরুষ, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন এলাকার মানুষ শেষবারের মতো তাদের দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ কাঁদছেন আপনজন হারানোর বেদনায়, কেউ প্রতিবেশী হারানোর শোকে, আবার কেউ শৈশবের বন্ধুকে হারিয়ে ভেঙে পড়েন।
এদিকে জানাজায় অংশ নিতে আসা লোকজনকে প্রচণ্ড গরমের তীব্রতা থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে কেউ স্বেচ্ছায় পানি ও শরবত বিতরণ করেন। অন্যদিকে সকাল থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক, ইসলামী ও সামাজিক সংগঠনের শোক ব্যানারে ছেয়ে যায় এলাকার অলিগলি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসঙ্গে একই পরিবারের চার ভাইয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ। পাশাপাশি রাখা চারটি কফিন দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
বুধবার সকাল ১১টায় স্থানীয় স্কুল মাঠে চার ভাইয়ের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, ইসলামিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে আগে থেকেই প্রস্তুত করা স্থানীয় কবরস্থানে পাশাপাশি খনন করা চারটি কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
নিহতরা হলেন— রাশেদুল ইসলাম (৪১), শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তারা সবাই বান্দারাজার পাড়া এলাকার মৃত আবদুল মজিদের সন্তান। নিহতদের মধ্যে বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম বিবাহিত ছিলেন। তার পরিবারে স্ত্রী, তিন বছর বয়সী এক কন্যা ও তিন মাস বয়সী এক পুত্রসন্তান রয়েছে। মেজ ভাই শাহেদুল ইসলামও বিবাহিত ছিলেন। ছোট দুই ভাই সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম অবিবাহিত ছিলেন।
চার ভাইকে হারিয়ে দেশে অবস্থান করা তাদের একমাত্র ভাই এনামুল ইসলামও ভেঙে পড়েছেন। একসঙ্গে চার সহোদরের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
স্বজনদের দাবি, পরিবারের অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে এতদিন পুরো ঘটনা জানানো হয়নি। সন্তানদের মরদেহ ঘরে আসা পর্যন্ত তিনি মনে করছিলেন, তার সন্তানরা আহত অবস্থায় দেশে ফিরছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চার ছেলে একসঙ্গে কফিনবন্দী হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
স্থানীয় প্রবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর অচেতন অবস্থায় চার ভাইকে দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ওমান পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসগ্রহণের ফলেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
একই পরিবারের চার সহোদরের এমন মৃত্যুতে রাঙ্গুনিয়াজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
