উত্তাল কর্ণফুলীতে সাহসিকতার গল্প: পাঁচ প্রাণ বাঁচিয়ে পুলিশের সম্মাননা পেল চার কিশোর
রাঙ্গুনিয়া টুডে প্রতিবেদক: কর্ণফুলী নদীর উত্তাল স্রোত, ঝড়ো বাতাস আর মুহূর্তের আতঙ্ক। নদীর বুকে ডুবে যাচ্ছে একটি নৌকা। চারদিকে কান্না আর বাঁচাও-বাঁচাও চিৎকার। এমন সংকটময় মুহূর্তে নিজের জীবনের কথা না ভেবে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁচটি প্রাণ রক্ষা করেছে রাঙ্গুনিয়ার চার সাহসী কিশোর।
তাদের এই মানবিক ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ সম্মাননা ও পুরস্কার দিয়েছে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাহসী কিশোর মুহাম্মদ রবিউল্লাহ, মুহাম্মদ সাইমন, মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও মুহাম্মদ অলিউল্লাহর হাতে সম্মাননা তুলে দেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (রাঙ্গুনিয়া সার্কেল) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এবং রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জহির উদ্দিন।
জানা যায়, গত বুধবার (২৮ মে) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চন্দ্রঘোনা-কদমতলি ইউনিয়নের দেওয়ানজি ঘাট ও কোদালা ঘাটের মাঝামাঝি এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে একটি নৌকা ডুবে যায়। নৌকাটিতে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় যাত্রীরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়লে ১৫ বছর বয়সী রবিউল্লাহ কোনো দ্বিধা না করে নদীতে ঝাঁপ দেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে দ্রুত বাবার ইঞ্জিনচালিত বোট নিয়ে এগিয়ে আসেন সাইমন। তার সঙ্গে যোগ দেন আব্দুল্লাহ ও অলিউল্লাহ। প্রবল স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে চার কিশোর শুরু করে উদ্ধার অভিযান।
মাত্র ১০ মিনিটের চেষ্টায় তারা দুই শিশুসহ পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধারকাজের সময় রবিউল্লাহর পায়ে আঘাত লাগলেও তিনি থেমে যাননি। মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
সম্মাননা পেয়ে উচ্ছ্বসিত চার কিশোর বলেন, “মানুষকে বাঁচাতে পেরেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। আমাদের কাজের মূল্যায়ন করায় আমরা কৃতজ্ঞ।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, “এই কিশোরদের সাহসিকতা ও মানবিকতা আমাদের সমাজের জন্য অনুকরণীয়। তাদের এই উদ্যোগ অন্যদেরও বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।”
অনুষ্ঠানে রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ ইলিয়াস তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার চৌধুরীসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্ণফুলীর নৌকাডুবির সেই ভয়াল মুহূর্তে চার কিশোরের সাহসিকতা শুধু পাঁচটি প্রাণই রক্ষা করেনি, মানবতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ মে চন্দ্রঘোনা-কদমতলি ইউনিয়নের দেওয়ানজি ঘাট ও কোদালা ঘাটের মাঝামাঝি এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় একই পরিবারের সদস্যরা দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই ঘটনায় চার কিশোরের সাহসিকতায় দুই শিশুসহ পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নববধূ কনিকা দাশ নিখোঁজ হন।
ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও শনিবার রাত পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় নদীতে জোয়ারের শেষ মুহূর্ত চলছিল। পরে ভাটার টানে তিনি অনেক দূরে ভেসে যেতে পারেন।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেউ নিখোঁজ কনিকা দাশের সন্ধান পেলে দ্রুত রাঙ্গুনিয়া ফায়ার সার্ভিসকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। জরুরি যোগাযোগ নম্বর: ০১৯০১০২১৫৮১।
