
“আশরেফা খাতুনের ভেরিফায়েড ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ছবি”
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আশরেফা খাতুন একজন এজিএস প্রার্থী। তার ব্যালট নং – ৫। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি হঠাৎ তার জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তার রিকশাওয়ালা পিতাকে স্মরণ করেন। তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন, যা নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো।”
আমরা যখন অনেকটা ছোট তখন আব্বুর অনেক বড় লস হয়। টাকাপয়সার প্রচন্ড টানাটানি। ঢাকায় থাকতাম তখন। আপু স্কুলে যায়। আমি তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করি নাই। তিনটা ছেলেমেয়ের খরচ চালানো, পড়াশোনার পরিবেশ রাখার জন্য আমার আব্বু এই ঢাকা শহরে রিকশা চালানো শুরু করে। আম্মু গার্মেন্টসে চাকরি করেছে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন টেষ্ট পর্যন্ত। তারপরও খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে যেতো বলে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে আব্বু-আম্মু ঢাকায় থাকতো। আম্মুকে কখনো কাছে পাই নাই। নানু যতদিন বেঁচে ছিল তার কাছেই বড় হয়েছি। আপু পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের দেখতো। আম্মু সাথে না থাকার কারণে কত মানুষের কত কটু কথা যে শুনেছি! এমনও হয়েছে যে বাড়ি থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমি আর আপু। এখনো গ্রামে গেলে পুরোনো অভ্যাসবশত ঘর থেকে বের হতে মনে চায় না। আপু বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে চলে গেল খুলনায়। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। রান্নাবান্না করে রেখে পরীক্ষা দিতে যেতাম। কলেজে ভর্তি হলাম যখন তখন ঘরের কাজ, চারটা ব্যাচ টিউশন, নিজের কলেজ, ধানের মৌসুমে ধান কাটা-মাড়াই-সিদ্ধ সব করতাম আব্বুর সাথে মিলে। সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতাম। উঠেই টিউশনে যেতাম। রাইস কুকারে আব্বু ভর্তা-ভাত তুলে দিতো। কিন্তু আমি আর খাওয়ার সময় পেতাম না। তাড়াহুড়ো করে নিজে যেতাম স্যারের কাছে পড়তে। কলেজে ক্লাস করে দুইটার মধ্যে বাড়ি ফিরতাম। এসেই রান্নার প্রস্তুতি। এরমধ্যে স্কুলের টিফিন টাইমে আরেকটা ব্যাচ আসতো পড়তে। তাদের পড়ানো শেষে রান্না করতাম। স্কুল ছুটি হতে হতে আরেকটা ব্যাচ আসতো। কতদিন এমন হয়েছে যে তরকারি চুলায়, স্টুডেন্টরা চলে আসছে। আব্বু দোকান বন্ধ করে এসে তরকারি নামাতো। আমি ব্যাচ শেষ করেই আরেকটা টিউশনে যেতাম। দুপুরেও খাওয়া হতো না। একদম সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে গোসল, খাওয়াদাওয়া করতাম। আমার ওজন কমে ৪০-৪২ কেজি হয়ে গিয়েছিল। এডমিশন পর্যন্ত এভাবেই চলেছে। পানি আনতে কতদূর যাওয়া লাগতো। কলসটা কোমরে করে আনতেও মনে হতো পাহাড়সম ওজন।
আম্মু বাড়িতে আসার পরে একটু রান্না করা খাবার, একটু যত্ন পেয়েই মারাত্মক জ্বর এসে পড়লো একদিন। যত্ন পেয়ে অভ্যাস ছিল না। তখন বারবার কমলা খেতে চাইতাম। কিন্তু কমলা কিনে আনার মতোও সামর্থ্য ছিল না আমাদের। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমাকে আর একটা ঈদে জামা কিনে দিলো না আম্মু। খুব কেঁদেছিলাম সেইবার। আমি পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি প্রতিটা পরীক্ষায় সরকারি বৃত্তি পেয়েছি। ওই টাকায় পরেরবার থেকে ঈদের ড্রেস বানাতাম। স্কুল ড্রেস ছিঁড়ে গেলেও বলতাম না, সেলাই করে পরতাম। সেল্ফ এমপাওয়ার্ড হওয়া শুরু আমার তখন থেকে। এডমিশনের সময় পড়া, ঢাকা আসা, ফর্ম তোলা সব আমার টিউশনের টাকায় করেছি। ভর্তির সময় অবশ্য দুইজন বড় ভাই হেল্প করেছেন। তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম, কিন্তু আব্বু ভর্তি হতে দিতে রাজি না। কারণ খরচ দিতে পারবে না। আমি জিদ করলাম। গ্রামে থাকতেই ঢাকায় টিউশন ম্যানেজ করে এসেছিলাম। ৩৫০০ টাকা, সপ্তাহে ৪ দিন, সব সাবজেক্ট। আমার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি। ওই টাকা দিয়ে নিজে চলতাম। বাড়িতে টিউশনের টাকা পাঠাতাম। সেই যে শুরু, এখনো চলছে। বাড়িতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে না পারলে মন খচখচ করে এখনো। আপু সরকারি চাকরি করে এখন। তাও আমি সংসারের সিংহভাগ খরচ চালানোর চেষ্টা করি এখনো। আব্বু-আম্মু যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন ইনশাল্লাহ আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো।
এতখানি বলার কারণ হলো এটা বোঝানো যে আমি মোটামুটি বুঝতে শেখার পর থেকেই স্বাধীনচেতা। ডিপেন্ডেন্ট না থাকার চেষ্টা করেছি সবসময়। আমি ভাবতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ হবে আত্মমর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু বাধ সাধলো ভর্তির অল্প কয়েকদিনের মাথায়। দেখলাম আমার এক বন্ধুর পায়ে ঘায়ের মতো হয়ে গিয়েছে ছারপোকার কামড়ে। জিজ্ঞেস করলাম এত বাজে অবস্থা হওয়ার কারণ। বলল, ৬ জনের রুমে ৪২ জন থাকে। এটাকে গণরুম বলে। দেখতাম ওরা ক্লাস শেষেই হলে ফিরতো। বলতাম আড্ডা দিতে। কিন্তু ওরা না কি রাতে ঘুমাতে পারে না, দিনের বেলা রুমে একটু জায়গা পাওয়া যায় ঘুমানোর। রাত হলেই বড় ভাইরা ওদেরকে রুম থেকে বের করে দিতো। ওদের বলতো হাতিরঝিল,শহীদ মিনারে ঘুরে বেড়াতে। ওদেরকে গেস্টরুমে গালিগালাজ করতো। আমার বন্ধু ইফাজ একদিন বলেছিল, ওর মৃত বাপকে নিয়েও গালি দেয় গেস্টরুমে।
আমার মতো স্বাধীনচেতা,প্রায় মুক্ত মানুষের জন্য এটা ছিল স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার মতো। সেদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম-গেস্টরুম সহ সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু। আস্তে আস্তে দেখলাম আমার মতো আরো মানুষ আছে। আখতার ভাই ছিলেন আমার জন্য অনুপ্রেরণা। ওনাকে আমি প্রচন্ড শ্রদ্ধা করি ফার্স্ট ইয়ার থেকেই। সাত কলেজ অধিভুক্তি বাতিল আন্দোলনে যখন ভাইয়ের উপর ছাত্রলীগ হামলা করে তখনো ওনাকে বাঁচাতে আমরা ছয়টা মেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আখতার হোসেনদের মাইর খাওয়া লাগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেমের বিরুদ্ধে বারবার কথা বলেছি। এখনো বলছি, ভবিষ্যতেও বলবো ইনশাল্লাহ। আমার রিকশাচালক বাবা আমাকে বলেছে, ‘পেটে ভাত না থাকলেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়’
এখনো মাথা উঁচু করে বাঁচার চেষ্টা চলমান। দোয়া রাইখেন সবাই।
আশরেফা খাতুন
এজিএস পদপ্রার্থী
ব্যালট নং ০৫
ডাকসু নির্বাচন-২০২৫
