হাঁটুসমান কাদা ও নৌপথ পেরিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে ৭ বিজিবি

জাকির হোসেন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) : খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাঁটুসমান কাদা ও নৌপথ পেরিয়ে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ৭ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। খাদ্য ও চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত পাহাড়ি পরিবারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণসামগ্রী, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করেছেন বাহিনীটির সদস্যরা।

সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে ৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইশতিয়াক আহম্মদ ইবনে রিয়াজের নেতৃত্বে একটি দল দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের দুর্গম লক্ষিকার্বারী পাড়ার পাকুইজ্জাছড়া এলাকায় পৌঁছে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে। একই সঙ্গে ছোট মেরুং এলাকার চিটাইংগা পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছেও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়।

ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাটালিয়নের মেডিক্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন এম. আবদুল্লাহ আল-মামুন (এএমসি) অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ প্রদান করেন।

ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চলাকালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইশতিয়াক আহম্মদ ইবনে রিয়াজ বলেন, “বিজিবি দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনে সবসময় অঙ্গীকারবদ্ধ। গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় দুর্গম এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিজিবির মহাপরিচালকের নির্দেশনায় আমরা মাঠপর্যায়ে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এরই অংশ হিসেবে খাদ্য ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা জ্ঞানো চাকমা বলেন, “প্রতিবছর বন্যা হয়, কিন্তু আমাদের খোঁজ নিতে কেউ আসে না। এবার বিজিবি এসে আমাদের খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়েছে। এজন্য আমরা বিজিবির প্রতি কৃতজ্ঞ।”

৭০ বছর বয়সী লক্ষী চাকমা বলেন, “আমার পায়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘা। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। বিজিবি এসে ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়েছে। এতে আমি অনেক উপকৃত হয়েছি।”

এ সময় বাবুছড়া ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক (পিবিজিএমএস) মোহাম্মদ ইমরান হোসেনসহ বিজিবির অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিডিপি সদস্যরা ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।

দুর্গম পাকুইজ্জাছড়ার বন্যাদুর্গত মানুষের হাতে যখন ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ পৌঁছে যায়, তখন তাদের মুখের হাসিই প্রমাণ করে—দুর্যোগের সময়ে সামান্য মানবিক সহায়তাও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে কতটা মূল্যবান।

 

বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরেও বাঁচতে পারেননি সোলেমান, দুই দিন পর মিলল মরদেহ

রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কর্ণফুলী নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া মো. সোলেমানের (২০) মরদেহ দুই দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা ইউনিয়নের ভান্ডালজুড়ি এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত সোলেমান রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের পূর্ব সরফভাটা লোকমান মিস্ত্রীর বাড়ি এলাকার বাসিন্দা বদিউল আলমের ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সোলেমান ও তার বড় ভাই আব্দুল হালিম (৩০) একটি ডিঙ্গি নৌকায় করে কর্ণফুলী নদীতে ভেসে আসা লাকড়ি সংগ্রহ করতে যান। এ সময় নদীর তীব্র স্রোতের মুখে পড়ে নৌকাটি উল্টে গেলে দুই ভাই পানিতে পড়ে যান। আশপাশে থাকা অন্য লাকড়ি সংগ্রহকারীরা আব্দুল হালিমকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও সাঁতার না জানা সোলেমান মুহূর্তেই প্রবল স্রোতে তলিয়ে নিখোঁজ হন।

দুর্ঘটনার ভয়াবহ সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল হালিম বলেন, “আমার ছোট ভাই নৌকার পানি সেচ দিচ্ছিল। নৌকাটি যখন কিনারার দিকে আসছিল, তখন হঠাৎ একদিকে কাত হয়ে যায়। আমি জানতাম, আমার ভাই সাঁতার জানে না। তাই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। কিন্তু নৌকাটি ডুবে যায়। ডুবে যাওয়ার সময় সে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। এতে আমিও পানির নিচে তলিয়ে যাই। অনেকক্ষণ পর কোনোভাবে হাত ভাসাতে পারলে এক জেলে আমাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু আমার ভাইকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”

সোলেমান নিখোঁজ হওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও স্থানীয়রা উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে কর্ণফুলী নদীর তীব্র স্রোতের কারণে দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়েও তার সন্ধান মেলেনি।

অবশেষে সোমবার সকালে বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা ইউনিয়নের ভান্ডালজুড়ি এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় মরদেহটি উদ্ধার করা হলে সেটি সোলেমানের বলে শনাক্ত করা হয়।

রাঙ্গুনিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের টিম লিডার জাহেদুর রহমান বলেন, “নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে আমাদের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান চালায়। কিন্তু নদীর স্রোত বেশি থাকায় সেদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সোমবার সকালে বোয়ালখালীর ভান্ডালজুড়ি এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার হওয়ার খবর পাই। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

দুর্যোগেও থেমে নেই সওজ, সচল রাখা হচ্ছে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক

সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম): টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যায় যখন চট্টগ্রামের সাতকানিয়াসহ আশপাশের এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত, তখনও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছেন সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের কর্মীরা। বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকায় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানিতে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভারী যানবাহনসহ সব ধরনের যান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে শ্রমিকরা দ্রুত ইট, খোয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো সংস্কার করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় এসব গর্ত চালকদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় চালক ও যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

মাইক্রোবাস মালিক জিয়াবুল হক বলেন, “টানা বৃষ্টিতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার মধ্যেও সড়ক বিভাগের লোকজন মাঠে নেমে কাজ করছেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।”

ট্রাকচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, “মহাসড়কে গর্ত থাকলে ভারী যানবাহন চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। দ্রুত মেরামতের কারণে এখন চলাচল অনেকটাই নিরাপদ হয়েছে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা বর্ষণে মহাসড়কের যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা হচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক সচল রাখতে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের মতে, দুর্যোগের এ সময়ে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সড়ক দিয়েই ত্রাণবাহী যানবাহন, জরুরি চিকিৎসাসেবার গাড়ি, উদ্ধারকারী দল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করছে। ফলে দ্রুত সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ শুধু জনদুর্ভোগ কমাচ্ছে না, ত্রাণ ও জরুরি সেবাও নির্বিঘ্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দোহাজারী সড়ক ও জনপদ বিভাগের দক্ষিণ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, “টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের মইজ্জারটেক থেকে লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত একাধিক স্থানে সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যান চলাচল ব্যাহত না হওয়া এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে আমরা জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি ট্রাকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করছি। আবহাওয়া অনুকূলে এলে আরও টেকসই সংস্কারকাজ করা হবে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলেও মহাসড়ক সচল রাখতে আমাদের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।”