রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদের জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছে। শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দলীয় নেতাকর্মীরা। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন উপস্থিত অনেকে।
রোববার (১৪ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের নিজ এলাকায় নামাজে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দুপুরে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শেষবারের মতো তাকে দেখতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষেরও সমাগম ঘটে।
জানাজার আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যুবদল, ছাত্রদলসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্র, জেলা, উপজেলা এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এ সময় তারা মরহুমের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বক্তারা বলেন, “মাসুদ দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তার মৃত্যু দলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
তারা আরও বলেন, “দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও যদি একজন যুবদল নেতা প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন, তাহলে সাধারণ নেতাকর্মীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়বেন।”
হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বক্তারা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা অভিযোগ করেন, সিসিটিভি ফুটেজে খুনিদের শনাক্ত করা গেলেও ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ সময় তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
প্রসঙ্গত, শনিবার (১৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মো. মাকসুদুল হক চৌধুরী ওরফে মাসুদকে (৪৫)। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং মরহুম খালেক চৌধুরীর ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ধারণা, বালু ব্যবসা ও দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।
মাসুদকে গুলি করার খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলমের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার সময় মাসুদ চৌমুহনী বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সিএনজি অটোরিকশাযোগে আসা চার থেকে পাঁচজন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। পরে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এর আগে, হত্যার খবর মুহূর্তেই রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন যুবদল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। কাপ্তাই আঞ্চলিক সড়কের রাঙ্গুনিয়ার ইছাখালী এবং রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়। দুপুরের পর থেকে সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে মানবিক কারণে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। পরে পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে তারা মহাসড়ক থেকে সরে যান।
নিহত মাসুদের ভাই ও বেতাগী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।”
উল্লেখ্য, ঘটনার খবর পেয়ে শনিবার রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছুটে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এ সময় নিহতের স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে সেখানে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনিও।
