বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ইলা বড়ুয়া: অবসরেও থামেনি পাঠদান

এস এম আক্কাছ, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম):

অবসর নিয়েছেন ছয় বছর আগে। কিন্তু থামেনি তাঁর পাঠদান। বয়সের ভার শরীরে, হাতে এখনো চক-ডাস্টার। প্রতিদিনের মতো বিদ্যালয়ে এসে দাঁড়ান শ্রেণিকক্ষে। সামনে থাকে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। আর শুরু হয় পাঠদান। তিনি ইলা বড়ুয়া—শিক্ষকতা যাঁর কাছে শুধু চাকরি নয়, আজীবনের দায়িত্ব ও ভালোবাসার জায়গা।

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব ও শিক্ষকদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই দিনে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন ফটিকছড়ির শিক্ষক ইলা বড়ুয়া। ২০১৯ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি প্রতিদিন ছুটে যান হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নেন তিন থেকে চারটি ক্লাস।

নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হিসাববিজ্ঞান পড়ান তিনি। প্রয়োজন হলে অষ্টম শ্রেণির বাংলা ক্লাসও নেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা এখনো বিলিয়ে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের মাঝে।

ইলা বড়ুয়ার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নের শুরু ছোটবেলায়। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান তিনি। তাঁর বাবা ভূপেন্দ্র লাল বড়ুয়া ছিলেন সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। বাবাকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখে ছোটবেলাতেই তাঁর মনে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন জাগে। সেই স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয় তাঁর পথচলা।

১৯৮১ সালে হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ইলা বড়ুয়া। পরের বছর স্বামীর চাকরির সুবাদে ঢাকায় চলে যান। সেখানে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনি স্কুলে এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাদারটেক বাসাবো বাগানবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

১৯৮৮ সালে আবার ফিরে আসেন হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর কেটে যায় কয়েক দশক। দীর্ঘ এই সময়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। হিসাববিজ্ঞান ছিল তাঁর মূল বিষয়।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার শিক্ষাও দিয়েছেন তিনি। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অনেক শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষার্থীদের প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশও; কিন্তু শ্রেণিকক্ষের প্রতি ইলা বড়ুয়ার ভালোবাসা বদলায়নি।

অবসরের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁকে পুরোপুরি বিদায় দিতে চায়নি। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নতুন প্রজন্মের কাজে লাগুক—এমন প্রত্যাশা থেকেই ২০১৯ সাল থেকে অতিথি শিক্ষক হিসেবে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছেন তিনি।

প্রতিদিন তিন-চারটি ক্লাস নেওয়া এখন তাঁর নিয়মিত রুটিন। কখনো হিসাববিজ্ঞানের জটিল অঙ্ক বোঝান, কখনো বাংলা পড়ান। শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন ধৈর্য নিয়ে। বয়সের ছাপ শরীরে থাকলেও পাঠদানের সময় তাঁর কণ্ঠে কিংবা চোখে ক্লান্তির ছাপ দেখা যায় না।

ইলা বড়ুয়া বলেন, ‘যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল বাবাকে দেখে, সেই স্বপ্নের পথচলা এখনো থামেনি। থামাতে চাই না। প্রতিদিন তিন-চারটি ক্লাস, শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্ন আর পাঠদানের ব্যস্ততা—এসবের মধ্যেই যেন আমি নিজের আনন্দ খুঁজে পাই।’

দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে অনেকেই যখন বিশ্রামের জীবন বেছে নেন, তখনো ইলা বড়ুয়া ফিরে আসেন শ্রেণিকক্ষে। হাতে চক, সামনে শিক্ষার্থী আর সঙ্গে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাঁর এই পথচলা যেন মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষকতার কোনো অবসর নেই; জ্ঞান ও আলোর পথ দেখানোর দায়িত্ব আজীবনের।